বৃষ্টির দেশে

মেঘ ছুঁয়ে দেখতে কার মন না চায়। কেবল বৃষ্টিতে কি তার স্বাদ পাওয়া যায়? মেঘ-বৃষ্টি দুটিকেই হাতের নাগালে পেতে চাইলে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জি আপনার বিশ্বস্ত ঠিকানা। কারণ, চেরাপুঞ্জিতে কেবল পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতই হয় না, পাহাড়ি এলাকার গা ঘেষে সেখানে মেঘের নিত্য আনাগোনাও থাকে। অনেকেই হয়তো জানেন না- এই চেরাপুঞ্জি বাংলাদেশ থেকে কত দূর। ম্যাপ বের করে যদি হিসাব-নিকাশ করেন, তবে দেখবেন বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে চেরাপুঞ্জির দূরত্ব সোজাসুজি কুড়ি কিলোমিটারেরও কম। বাড়ির পাশেই বিশ্বের বৃষ্টিবহুল এই এলাকা, সেখানে বৃষ্টি উপভোগ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তাই আসছে ঈদের ছুটিতে  ঘুরে আসুন মেঘের রাজ্য থেকে।

যা দেখবেন-

ছবি –সুমন্ত গুপ্ত

চেরাপুঞ্জি যেতে হলে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে তামাবিল/ডাউকি বর্ডারে। ম্যাপ দেখে দূরত্ব কুড়ি কিলোমিটারের কম হলেও সীমান্তের যেখানে ইমিগ্রেশন অফিস আছে, সেই তামাবিল থেকে চেরাপুঞ্জি যেতে আপনাকে ঘুরতে হবে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ। আর এটুকু পথ পেরুতে সময় লাগবে অন্তত দুই ঘণ্টা। শিলংয়ের দূরত্ব এর চেয়ে সামান্য বেশি, সময়ও একটু বেশি লাগতে পারে। তবে সীমান্ত পার হয়ে যখন পাহাড়চূড়ার আঁকাবাঁকা পথে চলতে থাকবেন তখন মনে হবে এই দূরত্ব আরো বেশি হলেই বোধহয় ভালো ছিল। চলার পথে আপনাকে সঙ্গ দেবে চারপাশের অসাধারণ সুন্দর সব পাহাড়। কখনো আপনাকে চারপাশ থেকে ঢেকে দেবে মেঘ। প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে মনে হবে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়া যাযাবর। কখনো বা পাহাড়ের ঢালে সরু রাস্তার আরেক পাশেই গভীর খাদ। এ এক ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ দৃশ্য চলতি পথে প্রথমেই দেখা পাবেন মাওডাক উপত্যকা। মিষ্টি রোদের ঝলক গোটা উপত্যকাকে যেন স্নান করিয়েছে। বর্ষাকালে এমন রোদ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার বলা যায়। একদিকে সারি সারি পাইনগাছ, অন্যদিকে গভীর খাদ। চেরাপুঞ্জি যাওয়ার রাস্তাটিও অসাধারণ। আঁকাবাঁকা। চেরাপুঞ্জিতে ঢোকার আগে সেতুতে দেখা পাবেন মেঘের ভেলার। সেই মেঘের ভেলা আপনাকে ছুঁয়ে যাবে আলতো করে। উঁচুনিচু পাহাড়গুলো পরস্পরের ঘা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের উপত্যকাগুলোতে রঙের বৈচিত্র্য—কোনোটা গাঢ় সবুজ, কোনোটা হালকা সবুজ, কোনোটা বা আবার হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। পথে নাশতা করে নিতে পারেন ‘অরেঞ্জ রেস্টুরেন্টে’ থেকে । এখানে ১৫০ রুপি দিয়ে ছয় আইটেম তরকারির সঙ্গে পাপড়, রুটি, ভাত যেকোনো কিছু খেতে পারবেন, যত ইচ্ছে তত। দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবেন সেভেন সিস্টার্স ফলে।সেই উঁচু পাহাড় থেকে সমতলে নেমে গেছে জল ধারা। দেখলে চোখ ও মন দুইটাই ভরে যাবে আপনার। এরপর চলে যান চেরাপুঞ্জির ‘মাওসমাই নংগিথিয়াং’ এলাকায়। এখানে সব সময় মেঘের দেখা পাওয়া যায়। চেরাপুঞ্জির প্রকৃত রূপ দেখার জায়গা এটা। এখানকার ইকোপার্কে বৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য রয়েছে নানা ব্যবস্থা। গোলচত্বর থেকে নিচে নেমে গেলে দেখা পাবেন দুটি দোলনা ঝুলছে। ইকোপার্কের এখান থেকেই সেভেন সিস্টার্স ফলের পানি বেয়ে বেয়ে নামে। এখানে  ঢোকার জন্য ১০০ রুপি দিয়ে টিকেট কাটতে হবে। এখানে আছে ‘মাওসমাই’ গুহা। সাইজে ছোট এই গুহার ভেতরে আছে সুড়ঙ্গের মতো রাস্তা। পর্যটকদের চলাচলের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা আছে। ভেজা, কাদা মাখা পথ। সেই পথ কিছু জায়গায় এতটাই সরু যে আমাদের প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পার হতে হবে। গুহাটিতে বয়স্ক আর শিশুদের না নিয়ে ঢোকা ভালো। এখানে ২০ রুপি দিয়ে টিকেট নিতে হবে এবং ক্যামেরার জন্য দিতে হবে আরো ২০ রুপি। গুহা থেকে বের হয়ে যেতে পারেন  চেরাপুঞ্জির রামকৃষ্ণ মিশনে। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৩ সালে। এখানে আদিবাসীর হাতে তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি হয়। আছে জাদুঘরও। আদিবাসীদের ঐতিহ্য বেশ কিছু নিদর্শনের দেখা মিলবে এখানে। মিশনের পরিবেশও বেশ নিরিবিলি। এখানে আদিবাসী ও বাঙালি মিলে দুই হাজার ২০০ ছাত্র পড়াশোনা করে।এর পর চলে যান  ‘মাওত্রো ত্রোপ’। এখানে বিশাল দৈত্যাকার একটি পাথরের দেখা মেলে, যা খাসিয়াদের উল্টানো চোঙ্গাকৃতির ঝুড়ির মতো। প্রচলিত লোককাহিনী মতে, পাথরের ঝুড়িটা নাকি আসলে এক অশুভ দৈত্যের। এই দৈত্য মানুষের ক্ষতিসাধন করে বেড়াত। এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ ধারালো লোহা এবং পেরেক মেশানো খাবার খেতে দিয়েছিল তাকে। আর এই খাবার খেয়েই নাকি দৈত্যটির মৃত্যু ঘটে। দৈত্যটির সঙ্গে থাকা ঝুড়িটি নাকি একসময় ২০০ ফিট উঁচু পাথরে পরিণত হয়। কিছু পরে পাবেন  ‘নোকালিকাই ঝরনা’। ঝরনায় পৌঁছানোর পথে পড়ল বেশ কিছু টিলা। টিলাগুলো কেয়াগাছে ভরা। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে ‘লিকাই’ নামের এক নারী পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এখানে আত্মাহুতি দেওয়ায় জলপ্রপাতটির নাম ‘নোকালিকাই’। এটির চারটি ধারা একই সঙ্গে পাহাড় থেকে নিচে নামছিল। এখান থেকেই বাংলাদেশ দেখা যায়। চেরাপুঞ্জিতে ঘুরে বেড়ানোর সুবিধা হলো সব ঝরনা গাড়িতে বসে ঘুরে দেখা যায়। হেঁটে পাহাড়ে ওঠার দরকার পড়ে না।

ছবি – সুমন্ত গুপ্ত

জেনে রাখা ভালো

চেরাপুঞ্জি বেড়ানোর সময় মে থেকে নভেম্বর মাস। তবে বৃষ্টির জন্য জুন-জুলাই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো সময়। চেরাপুঞ্জি মানেই বৃষ্টি। ছাতা, বর্ষাতি ও রাবারের জুতো সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। চেরাপুঞ্জিতে ছোট একটি মার্কেট আছে পর্যটকদের জন্য। তবে সব কিছুর দাম একটু বেশি। মেঘালয়ে সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষা খাসিয়া। পরদেশিদের সঙ্গে অবশ্য হিন্দি-ইংরেজি মেশানো এক মিশ্র ভাষায় কথা বলে স্থানীয়রা। ভাড়া করা ট্যাক্সিই চেরাপুঞ্জিতে বেড়ানোর সবচেয়ে ভালো বাহন। তবে বড় দল হলে শিলং থেকে বাস ভাড়া করেও চেরাপুঞ্জি বেড়িয়ে আসা যায়। শিলং বা চেরাপুঞ্জিতে থাকা, খাওয়া ও গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর খরচটা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে কিছুটা বেশি। তামাবিল সীমান্তে ভ্রমণ কর দেওয়ার মতো ব্যাংক নেই, এ জন্য বেশ খানিকটা দূরে যেতে হতে পারে। তাই ঢাকা থেকেই ভ্রমণ কর পরিশোধ করে যাওয়া ভালো। এ ছাড়া সীমান্ত পার হওয়ার পর মুদ্রা বিনিময়ের সুযোগও খুব সীমিত। তাই প্রাথমিক ঘোরাফেরার জন্য যত দূর সম্ভব সীমান্ত এলাকায়ই বেশ কিছু ডলার ভাঙিয়ে নিন।

ছবি – সুমন্ত গুপ্ত

থাকতে চাইলে

চেরাপুঞ্জিতে থাকার জন্য তেমন ভালো কোনো হোটেল নেই। থাকতে পারেন শিলং শহরে। এখানে মিলবে বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল।

হোটেল সেরিনা, ফোন : +৯১-০৩৬৪-২৫০১৭, +৯১-৯৭৭৪৫৩৯৫৮৩  , বাবা ট্যুরিস্ট লজ, ফোন : +৯১-০৩৬৪-২২১১২৮৫, +৯১-০৩৬৪-২২২০৯১৭

হোটেল সেন্ট্রাল পয়েন্ট, ফোন : +৯১-০৩৬৪-২২২৫২১০  , হোটেল পলোতোওয়ার, ফোন : +৯১-০৩৬৪-২২২২-৩৪১

ছবি – সুমন্ত গুপ্ত

যাবেন যেভাবে

ঢাকা থেকে সিলেট, বাসে অথবা ট্রেনে ভাড়া পড়বে ৩২০ থেকে ১২০০ টাকা। সেখান থেকে শহরে এসে বাসে/সিএনজিচালিত অটো রিকশা/গাড়ি ভাড়া করে তামাবিল। ভাড়া পড়বে ১০০ থেকে ২৫০০ টাকা ভারতের পাহাড়গুলোর ঠিক পাদদেশে বাংলাদেশের এই প্রান্তে সমতলভূমিতে ইমিগ্রেশন-কাস্টম অফিতাক সীমান্ত পার হলেই জায়গাটার নাম ডাউকি। ইমিগ্রেশন-কাস্টমের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ভাড়া করতে হবে ট্যাক্সি। সেখান থেকে জিপ অথবা ট্যাক্সি সোজা চেরাপুঞ্জি। ভাড়া দুই হাজার পাঁচশত থেকে তিন হাজার রুপি। আবার শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি জিপ বা ট্যাক্সি ভাড়া তিন হাজার থেকে তিন হাজার পাঁচশত রুপি (সাইটসিন ভিজিটসহ)। এ ছাড়া আছে লোকাল বাসও।চেরাপুঞ্জি ঘুরে চাইলে শিলং শহরে ঘুরতে যেতে পারেন অথবা ফিরে আসতে পারেন নিজ দেশে।

 

লেখকঃ সুমন্ত গুপ্ত

ntv online থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *